আপনার বাচ্চাকে কিভাবে পুড়ে যাওয়ার হাত থেকে নিরাপদ রাখবেন?
আমরা আমাদের হাসপাতাল এ যত বার্ন রোগীর চিকিৎসা দেই, এর বড় একটি অংশ জুড়েই থাকে বাচ্চারা।Scald, flame burn কিংবা High Voltage Electric burn – সব ধরনের বার্ন নিয়েই বাচ্চারা আসে আমাদের কাছে। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো বাচ্চাদের বার্ন
এর ৯৯% দুর্ঘটনাই ঘটে নিজ বাড়িতে, এমন কি ভয়াবহ রকমের high voltage electric burn ও। বাড়ির অভ্যন্তরে, রান্নাঘর, ডাইনিং কিংবা বাথরুম, বেলকনি এমনকি ছাদে গিয়েও বাচ্চারা দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে।
প্রথমেই আসছি flame burn, মানে আগুনে পুড়ে যাওয়া নিয়ে। সাধারণত একটু বড় বাচ্চারা মাকে লুকিয়ে রান্নাঘর এ খেলতে গিয়ে কিংবা কিছু রান্না করতে গিয়ে ফ্রকে আগুন ধরে যায়। এছাড়া কারেন্ট চলে গেলে মোমবাতি থেকে কিংবা গ্রামের দিকে কুপি বাতি থেকেও অসাবধানতাবশত আগুন ধরে যায় জামাতে। এমনকি আগুন নিয়ে খেলতে গিয়ে এক বাচ্চা আরেক বাচ্চার ফ্রকে আগুন দিয়ে দিয়েছে এমন রোগীও আমরা পেয়েছি।
এরপর আসে scald, এটি হয় সাধারণত গরম পানি, গরম তেল , ভাতের মার, ডাল, চা কফি পড়ে হয়ে থাকে। অপেক্ষাকৃত ছোট বাচ্চারা আক্রান্ত হয় বেশি। এরা চুপাচাপে বড়দের চোখ ফাঁকি দিয়ে রান্নাঘর এ ঢুকে যায় এবং ফুটন্ত ভাত বা ডাল তরকারির পাতিল গায়ে উল্টে ফেলে। একদম ছোট বাচ্চা ডালের পাতিলের ভিতরে পড়ে গেছে এমন কেস ও আমরা প্রচুর পাই। অনেক সময় মা ছোট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে রান্নার কাজ করতে গিয়েও দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেন। অনেক সময় দেখা যায় মা হয়ত বাচ্চার জন্য দুধ বানাবেন বলে গরম পানির পাতিল টা মাত্রই টেবিল এর কোনায় রেখেছেন, বাচ্চা দৌড়ে গিয়ে উল্টে ফেলে দিল একদম নিজের গায়ে। এছাড়াও অনেকে বাচ্চা কোলে নিয়ে চা কিংবা কফি পান করতে গিয়ে ঘটিয়ে ফেলেন দুর্ঘটনা। আরও ভয়াবহ টাইপ দুর্ঘটনার রোগীও আমার পাই। ছোট বাচ্চা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাড়ির পাশের রেস্টুরেন্ট এ পুরি সিঙ্গাড়া দেখছিল, কিভাবে যেন গিয়ে পড়েছে ফুটন্ত তেলের কড়াই তে।
সামনে শীতকাল আসছে, বাচ্চাদের scald এর ঘটনা বেড়ে যাবে কয়েক গুন। গোসলের জন্য প্রায় সবাই গরম পানি ব্যবহার করবেন। এই ফুটন্ত পানির পাতিল রান্নাঘর থেকে বাথরুম এ নিয়ে যাচ্ছেন, ছোট বাচ্চা দৌড়ে এসে দিল ধাক্কা। পাতিলের পুরো পানি টাই পড়লো বাচ্চার উপরে। আবার যারা বাড়িতে গিজার লাগিয়েছেন, বালতি ভর্তি পানির তাপমাত্রা চেক না করেই হয়ত বাচ্চাকে বসিয়ে দিয়েছে টাব কিংবা বালতির ভিতর।

এবার আসছি High Voltage Electric Burn এর ক্ষেত্রে। এটি ভয়াবহ, হয়ত জীবন বাঁচাতে আমাদেরকে প্রায়শই হাত পা কেটে ফেলে দিতে হয় কিংবা হাত পা যদিও বাঁচানো যায়, সেটি থাকে নাম মাত্র। সেই হাত দিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোন কাজ করতে পারে না। High Voltage Electric Burn এর বেশিরভাগ ঘটনা ঘটে বাড়ির তিনটি স্হান এ- বাড়ির অভ্যন্তরে, বারান্দা এবং ছাদে। একদম ছোট বাচ্চারা কৌতুহল বশত প্লাগের ভিতর আঙ্গুল ঢুকিয়ে দেয়। এছাড়াও গরম iron, blender, hair iron, rice cooker এরকম কিছু ব্যবহার যোগ্য জিনিস থেকে electric burn হতে পারে।
একটু বড় বাচ্চাদের ছাদে কিংবা বেলকনিতে খেলতে হয় Electric Burn হয়। যেসকল বাড়ির খুব পাশ দিয়ে হাই ভোল্টেজ ইলেকট্রিক তার চলে গিয়েছে, তাদের দুর্ঘটনা বেশি হয়। বাচ্চারা বারান্দায় খেলতে গিয়ে লাঠি কিংবা জানালার পর্দার পাইপ দিয়ে তারে খোঁচাতে যায়। অনেক সময় খেলনা কিংবা কাপড় উড়ে গিয়ে তারে পড়ে, লাঠি দিয়ে সেটিকে আনতে গিয়েও হয় নানা দূর্ঘটনা।
ছাদে গিয়েও ঘটে একই দুর্ঘটনা। হয়ত ছাদের উপর কিংবা খুব পাশ দিয়েই চলে গেছে হাই ভোল্টেজ তার, খেলতে গিয়ে অসাবধানে তার ছুঁয়ে দেয়। অনেক সময় ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে, কবুতর ধরতে গিয়েও ঘটে যায় মারাত্মক সব দুর্ঘটনা।

কিন্ত এই ঘটনাগুলো খুব সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রয়োজন একটু সচেতনতা। Burn prevention এর আসলে কোন বিকল্প নেই। তাই আসুন, যাদের বাড়িতে ছোট বাচ্চা আছে, আমরা এই অভ্যাস গুলো গড়ে তুলি..
১. ছোট বাচ্চাদের কোনভাবেই আগুন নিয়ে খেলতে দেয়া যাবে না, বিশেষ করে রান্না ঘরে। একদম ছোটরা যেন একা রান্নাঘর এ না ঢুকে যায়। প্রয়োজন এ রান্নার কাজ শেষে রান্নাঘর এর দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে রাখতে হবে।
২. মোমবাতি কিংবা কুপিবাতি বাচ্চার হাতে না দেয়াই উত্তম
৩. রান্নার সময় একদম ছোট বাচ্চারা যেন হামাগুড়ি দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে যেতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যদি সম্ভব হয়, বাচ্চা কোলে নিয়ে রান্না না করাই উত্তম।
৩. একদম ছোট বাচ্চা কোলে নিয়ে গরম চা কিংবা কফি পান করবেন না।
৪.শীতকালে গোসলের জন্য করা গরম পানি কোনভাবেই পাতিলে করে রান্নাঘর থেকে বাথরুম এ নিয়ে যাবেন না। অবশ্যই পানি পরিবহনের জন্য বড় বালতি ব্যবহার করতে হবে।
৫. বাড়িতে গিজার ব্যবহার করলে, বাচ্চার শরীরে পানি ঢালার আগে অবশ্যই আঙ্গুল ডুবিয়ে পানির তাপমাত্রা চেক করতে হবে।
৬. রান্নাঘর থেকে ডাইনিং টেবিলে গরম ডাল তরকারির বাটি কিংবা পাতিল নিয়ে যাবার আগে দুপাশ তাকিয়ে দেখে নেয়া উত্তম, বাচ্চা দৌড়ে আসছে কিনা। ধাক্কা যেন না লাগে।
৭. বাড়িতে ছোট বাচ্চা থাকলে দেয়ালের একদম নিচের দিকের প্লাগ এর ইলেকট্রিক কানেকশন বন্ধ করে রাখাই উত্তম। যেন আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিলেও কোন দুর্ঘটনা না ঘটে কিংবা ঢেকে দিতে হবে।
৮. ইস্ত্রি, কুকার, ইনডাকশন চুলা ব্যবহার এ সতর্ক হতে হবে।
৯. কোনভাবেই ভেজা হাত দিয়ে লাইট কিংবা ফ্যান এর সুইচ অন করা যাবে না।
১০. মাথার কাছে ফ্যান কিংবা ল্যাপটপ চার্জ এ দিয়ে ঘুমাতে যাবেন না।
১১. ছাদের কিংবা বেলকনির খুব পাশ দিয়ে যদি হাই ভোল্টেজ ইলেকট্রিক তার গিয়ে থাকে তবে এমন ব্যবস্থা করতে হবে যেন বাচ্চারা কোনভাবেই তার এর সংস্পর্শে না আসে। বেলকনি কিংবা ছাদের ওই দিকটা আমরা খুব সহজেই বোর্ড দিয়ে বন্ধ করে দিতে পারি যেন বাচ্চারা সহজেই স্পর্শ না করতে পারে।
১২. সর্বোপরি বাচ্চাদের বার্ন এর ভয়াবহতা এবং এর থেকে কিভাবে তারা নিজেদের কে নিরাপদে রাখবে সেই শিক্ষা দিতে হবে।
বার্ন ভয়াবহ। প্রথমেই চলে জীবন রক্ষার লড়াই। এরপর রিকন্সট্রাকশন। তারপর তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার যুদ্ধ। তাকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করতে একে একে হাজির হয় scar, scar contracture সহ আরও অনেক কিছু। পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবন কারো কারো কাছে স্বপ্নই থেকে যায়।
অথচ Burn Prevention এর কোন বিকল্প নেই। প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাড়তি কিছু সাবধানতা।
#Burn
#Burn Prevention
#Burn Awareness
ধন্যবাদ সবাই কে।
ডা. নুরুননাহার লতা
এমবিবিএস (ডিএমসি), এমএস (প্লাস্টিক সার্জারি)
সহযোগী অধ্যাপক, প্লাস্টিক সার্জারি
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি, ঢাকা, বাংলাদেশ।
হ্যান্ড সার্জারি ও বার্ন বিষয়ে ইংল্যান্ড, সিংগাপুর এবং চায়নায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত
BFIRST Fellow (ইংল্যান্ড)
চেম্বার:
কনসালট্যান্ট প্লাস্টিক, রিকনস্ট্রাকটিভ, হ্যান্ড অ্যান্ড বার্ন সার্জন
রুম নং: ২১০
এমএইচ সামরিতা হাসপাতাল অ্যান্ড মেডিকেল কলেজ, তেজগাঁও, ঢাকা।
সময়: রোববার, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার
বিকাল ৪.০০টা থেকে ৬.০০টা
সিরিয়ালের জন্য: ০১৮৭৬২৮৮১১৬
০১৯০৭৪৪৬০৭৮
Website : www.drlata.com
